বিপ্লবী-কমরেড-সুখেন্দু-দস্তিদার-কমরেড-বশির-ভাই

বিপ্লবী কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার কমরেড বশির ভাই


জন্ম: অজ্ঞাত । মৃত্যু : ১১ জুন ১৯৭৬ সাল। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ও কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার: বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের উপনিবেশিক শাসন শোষণ লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে মাষ্টার দা সূর্য সেনের নেতৃত্বে ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামে বৃটিশদের অস্রাগার লুণ্ঠন, চট্টগ্রামের বাটালী হিলে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনে জড়িত বিপ্লবীদের মধ্যে ছিলেন কিশোর বিপ্লবী কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার, তখন তাঁর বয়স ছিল ১৪ বছর।বিদ্রোহের কারণে তাঁকে আন্দামানে নির্বাসন দেয়া হয়। দ্বীপান্তর আবস্থায় থাকাকালে তিনি সাম্যবাদী রাজনীতি গ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে দ্বীপান্তর থেকে আসার পর চট্টগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টিতে জড়িত হন।


Hostens.com - A home for your website

পুর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি ও সুখেন্দু দস্তিদার:
১৯৫৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত পূর্বপাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে তাকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করা হয়। ১৯৫৩ সলে মহান নেতা কমরেড স্তালিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত রাশিয়ায় ক্রুশ্চভ চক্রের ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে সংশোধনবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটে। ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেসে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের শ্রেণী সংগ্রামের ভিত্তিতে, বল প্রয়োগের মাধ্যমে, বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে শ্রমিক শ্রণীর একনায়কত্ব কায়েম, মার্ক্সবাদ লেনিনবাদের মূল ধারকে বাদ দিয়ে, ক্রুশ্চভ – শান্তিপূর্ণ উত্তরণ, শান্তিপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা, শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থানের সংশোধনবাদী তত্ত্ব হাজির করে। এনিয়ে মস্কোতে ১২ পার্টির সম্মেলন, ৮১ পার্টির সম্মেলন এর মধ্য দিয়ে, মহান নেতা ও শিক্ষক কমরেড মাও সেতুং এর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব ক্রুশ্চভ চক্রের তীব্র বিতর্ক আরম্ভ হয়। ১৯৬১ সালের অক্টোবর মাসে সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির ২২তম কংগ্রেসে ক্রুশ্চভের সংশোধনবাদী তত্ত্ব গৃহীত হয়। ক্রুশ্চভ চক্রের সংশোধনবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে বিশ্বে বিতর্কের ঝড় উঠে, মাও সেতুং এর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সহ বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে মার্ক্সবাদ লেনিনবাদী ধারা এবং ক্রুশ্চভীয় সংশোধনবাদী ধারার মতাদর্শিক সংগ্রাম ভিন্নতায় রূপ নেয়। তখন পূর্বপাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেও মতাদর্শিক সংগ্রাম শুরু হয়। পূর্বপাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুখেন্দু দস্তিদার ( কমরেড বশির) , কেন্দ্রীয় সদস্য মোহাম্মদ তোয়াহ ( কমরেড খালেদ) , আবদুল হক ( কমরেড রহমত) পার্টিতে সংশোধনবাদী ধারার বিরুদ্ধে, মার্ক্সবাদ লেনিনবাদ ও মাও সেতুং এর চিন্তাধারার পক্ষে অবস্থান নেন।

 

পূর্বপাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি- মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী গঠন ও কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার:

 

কমরেড সুখেন্দু দস্তিদারের নেতৃত্বে একটি দলিল পেশ করা হয়, যাহা বশির খালেদ রহমত দলিল নামে খ্যাত। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ৩ বছর সময় ক্ষেপণ করেও কোন সিদ্ধান্তে না যাওয়ায় কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার, কমরেড তোয়াহা, কমরেড আবদুল হকের নেতৃত্বে মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদ, মাও সেতুং এর চিন্তা ধারায় বিশ্বাসী কমরেডদের নিয়ে ১৯৬৭ সালে ১- ৩ অক্টোবর সিলেটের চা বাগানে কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেসে পার্টির নামকরণ করা হয় পূর্বপাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি- মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী। উক্ত কংগ্রেসে কমরেড সুখেন্দু দস্তিদারকে পার্টির সাধারন সম্পাদক করা হয়। কংগ্রেসে গৃহীত দলিলে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের শ্রেণী সংগ্রামের ভিত্তিতে বল প্রয়োগের মাধ্যমে বুর্জোয়া ব্যবস্থা ভেঙ্গে শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার নীতি গ্রহণ করা হয়। দলিলে উল্লেখ করা হয়,” পূর্ববাংলার জনগণের উপর সাম্রাজ্যবাদ তথা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, পাকিস্তানের সামন্ত গুষ্ঠি ও তাদের সহযোগী আমলা প্রধান পুঁজির উলঙ্গ ও নিষ্ঠুর শোষণ, এই তিন শোষণ এবং উহাদের স্বার্থ রক্ষক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রব্যবস্থাই পূর্ববাংলার জনগণের প্রধান শত্রু। তাই পূর্ব বাংলা বাঁচার ও মুক্তির এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অর্জনের একমাত্র পথ হলো এই ঘুণধরা প্রতিক্রিয়াশীল শাসন ও শোষণ ব্যবস্থাকে সমূলে উচ্ছেদ করিয়া উহার স্থলে পূর্ব বাংলা স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করা। পূর্ব বাংলার এই নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের বিপ্লব হইল জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব।”

 

‘৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম – মুক্তিযুদ্ধ ও কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার :

 

সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের ‘৬২ আন্দোলন, ‘৬৮/’৬৯ এর গণজোয়ার, গণ অভ্যুত্থান সহ পাকিস্তানের শাসক শোষক গুষ্টির শোষণ, লুণ্ঠন, নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি ( এম- এল) এর সাধারন সম্পাদক হিসাবে তাঁর ব্যাপক ভূমিকা ছিল। ‘৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সময় কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার পার্টিতে ১ নং দলিল, কমরেড আবদুল হক ২ নং দলিল পেশ করেন। ১ নং দলিলে সুখেন্দু দস্তিদারের ব্যক্তব্য ছিল পাকিস্তানের শাসক গুষ্ঠি ও পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার জনগণের লড়াই হচ্ছে প্রধান দ্বন্দ্ব। ২ নং দলিলে আবদুল হকের ব্যক্তব্য ছিল ‘৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে দুই কুকুরের লড়াই। ২ নং দলিলের রচয়িতা কমরেড আবদুল হক ও তাঁর সহযোগীদের কারনে একক সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি, তাঁদের কারনেই পার্টি ভেঙ্গে যায়।

 

১ নং দলিলের ভিত্তিতে কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার, কমরেড তোয়াহার নেতৃত্বে লক্ষ্মীপুর নোয়াখালী সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পার্টির কমরেডগণ ও মেহনতি জনতা পাক হানাদার ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদর আলশামস এর বিরুদ্ধে সশস্র লড়াই সংগ্রাম শুরু করে, নোয়াখালী সদর, লক্ষ্মীপুর, রামগতির প্রায় ২০০ বর্গ মাইল এলাকায় তোয়াহা, সুখেন্দু দস্তিদারের নেতৃত্বে সাম্যবাদীরা মুক্ত অঞ্চল গঠন করে। দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যান্ত সাম্যবাদীরা উক্ত অঞ্চল মুক্ত রাখে ও সেখানে জনগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু রাখা হয়।

 

বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল- মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী ও কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার :

 

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পার্টির নামকরণ করা হয় বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল- মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী। কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার পুনরায় পার্টির সাধারন সম্পাদক হয়। ১৯৭৬ সালের ১১ জুন মৃত্যু পর্যান্ত তিনি পার্টির সাধারন সম্পাদক ছিলেন। কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার সারাটা জীবন সশস্র লড়াই, সংগ্রাম, দ্বীপান্তর, হুলিয়া মাথায় নিয়ে শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি জনতার রাজনীতি করেছিলেন। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন লড়াই, পাকিস্তানের শাসক শোষকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, পাকিস্তানিদের এ দেশ থেকে বিতাড়নে কমরেড সুখেন্দু দস্তিদারের ভূমিকা অতুলনীয়, এদেশে অসাম্প্রদায়িক শোষণ মুক্ত সমাজ গড়ার আন্দোলন লড়াইয়ে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা, অনন্তকাল এদেশের মার্ক্সবাদী লেনিনবাদীদের হৃদয়ে, চিন্তা চেতনায় বিপ্লবী পথপ্রদর্শক হিসাবে তিনি জাগ্রত থাকবেন। বাংলাদেশের সাম্যবাদী রাজনীতিতে তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের কমরেড, একজন সত্যিকারের সাম্যবাদী , তিনি পার্টি পরিচালনায় যথেষ্ট দৃঢ়তা ও ধৈয্যের পরিচয় দিতেন। তাঁর তাত্ত্বিক জ্ঞান ,দক্ষতার সহিত সংগঠন ও কমরেডদের পরিচালনায় তাঁর তুলনা তিনি নিজেই, লোভ লালসা মোহ এর উর্ধে থাকা সহয সরল জীবন যাপন, একজন সত্যিকারের সাম্যবাদী, সত্যিকারের বিপ্লবী যাঁর অভাব আমরা অনেক অনেক সময় অনুভব করব।

 

বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল – মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী ( সাবেক পূর্বপাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি – মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী) এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক বিপ্লবী সুখেন্দু দস্তিদার কমরেড বশির ভাই।

 

সম্পাদনা:

হাফিজ সরকার।

 

Facebook Comments